- ড. মুযাফফর বিন
মুহসিন
▬▬▬ ◈❥◈▬▬▬
উত্তর: প্রচলিত আছে
যে, ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে ২০
রাক‘আত তারাবীহর উপর
ইজমা হয়েছে। ইবনু
কুদামা (৫৪১-৬২০ হিঃ)
ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগের
কথিত ২০ রাক‘আতের
বর্ণনা উল্লেখ করে বলেছেন,
وَهَذَا كَالْإِجْمَاعِ ‘এটা যেন ইজমার
ন্যায়’।[১]
অতঃপর উক্ত বক্তব্য নকল
করেছেন ‘উমদাতুল ক্বারী’ প্রণেতা আল্লামা বদরুদ্দীন আয়নী হানাফী (মৃঃ
৮৫৫ হিঃ)।[২]
অথচ উক্ত বক্তব্য দ্বারা
কখনো ইজমা প্রমাণিত হয়
না। এদিকে
‘মিরক্বাত’ প্রণেতা মোল্লা আলী ক্বারী
হানাফী (মৃঃ ১০১৪ হিঃ)
হাযার বছর পর অত্যন্ত
জোর দিয়ে বলেছেন, ‘২০
রাক‘আত তারাবীহর উপর
ছাহাবীগণ ইজমা করেছেন’।[৩] এ কথাগুলো
যে মাযহাবপন্থীদের তা প্রমাণিত।
উক্ত দাবী সম্পূর্ণ
ভিত্তিহীন। ছাহাবীদের
যুগে ২০ রাক‘আত
চালু ছিল এটাই ছহীহ
দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। তাহলে
ইজমা হল কিভাবে? বর্তমানে
এটা বেশী বেশী প্রচার
করার কারণ হল, যখন
বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যায়
যে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে
১১ রাক‘আত তারাবীহ
পড়েছেন এবং ওমর (রাযিয়াল্লাহু
আনহু) ৮ রাক‘আত
পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন, তখন ২০ রাক‘আতের অবস্থা সম্পর্কে
মানুষের ধারণা পরিষ্কার হয়ে
যাচ্ছে। এটা
এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে
যেন আল্লাহর অহী। অথচ
চরম ভ্রান্তিপূর্ণ। যেমন-
(ক) মাযহাব ভিত্তিক
রচিত ফিক্বহের গ্রন্থ সমূহে বলা
হয়েছে যে, ইমাম মালেক
(৯৩-১৭৯ হিঃ) মসজিদে
নববীতে ৩৬ রাক‘আত
তারাবীহ পড়তেন। (যদিও
কথাটি সঠিক নয়)।
বিশেষ করে মোল্লা আলী
ক্বারী ও আল্লামা আয়নী
(রহঃ) বিভিন্ন ধরনের সংখ্যা উল্লেখ
করেছেন। উমদাতুল
ক্বারী প্রণেতা ৪১, ৩৯, ৪৭,
৩৬, ৩৪, ২৮, ২৪,
২০ ও ১১ বিভিন্ন
রাক‘আতের আমল ছিল
বলে উল্লেখ করেছেন।[৪] তাহলে ওমর
(রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যামানায়
মদীনাতে ২০ রাক‘আতের
উপর ইজমা হয়েছে কথাটি
কিভাবে সঠিক হতে পারে?
এটা কি বিভ্রান্তিকর নয়?
এতে প্রমাণিত হল যে, ওমর
(রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে
ইজমা হওয়ার দাবী কাল্পনিক।
(খ) ছহীহ হাদীছ
দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, ওমর
(রাযিয়াল্লাহু আনহু) ১১ রাক‘আত তারাবীহ পড়ার
নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর
খেলাফতের সময়েও জনগণ ১১
রাক‘আত তারাবীহ পড়তেন। সেটাও
ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত
হয়েছে। তাহলে
২০ রাক‘আতের উপর
ইজমা হল কখন?
এছাড়াও ইমাম মালেক (৯৩-১৭৯ হিঃ)-এর
নিজস্ব বক্তব্যেও ১১ রাক‘আতের
কথা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি
মদীনাতে জন্ম গ্রহণ করেছেন,
সেখানেই শিক্ষা লাভ করেছেন
এবং মসজিদে নববীতেই আজীবন
হাদীছের দারস প্রদান করেছেন। তিনি
১৭৯ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেছেন।[৫]
সুতরাং তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত
মদীনাতে ১১ রাক‘আতের
অতিরিক্ত রাক‘আত সংখ্যা
চালু হয়নি বলেই প্রতীয়মান
হয়। তাই
২০ রাক‘আতের উপর
ইজমা হওয়ার বিষয়টি ভিত্তিহীন।
(গ) মুহাদ্দিছগণের মন্তব্যে
প্রমাণিত হয়েছে যে, ২০
রাক‘আতের বর্ণনাগুলোর ছহীহ
কোন ভিত্তি নেই।
বরং সবই জাল, যঈফ
ও ভিত্তিহীন। সুতরাং
জাল ও দুর্বল সূত্রের
উপর ভিত্তি করে যদি
কোন বিষয়ে ইজমা করা
হয়, তাহলে সেটাও হবে
জাল ও দুর্বল।
যেমনটি শায়খ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)
বলেন,
لَايَعْلُوْ عَلَيْهِ لِأَنَّهُ بُنِىَ عَلَى ضَعِيْفٍ
وَمَا بُنِىَ عَلىَ ضَعِيْفٍ
فَهُوَ ضَعِيْفٌ
‘এই ইজমার প্রতি কখনো
আস্থাভাজন হওয়া যাবে না,
কারণ তা দুর্বল ভিত্তির
উপর প্রতিষ্ঠিত। আর
দুর্বল ভিত্তির উপর যা গড়ে
উঠে, সেটাও দুর্বল হয়’।[৬]
শায়খ আবদুর রহমান মুবারকপুরী
(রাহিমাহুল্লাহ) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন,
دَعْوَى الْإِجْمَاعِ عَلَى عِشْرِيْنَ رَكْعَةً
وَاسْتِقْرَارُ الْأَمْرِ عَلَى ذَلِكَ فِى
الْأَمْصَارِ بَاطِلَةٌ جِدًّا
‘বিশ রাক‘আতের প্রতি
ইজমা হয়েছে এবং সর্বত্র
তা স্থায়ী হয়েছে, এই
দাবী চরম মিথ্যা’।[৭]
দুর্ভাগ্য হল, আল্লাহর পক্ষ
থেকে প্রেরিত মহা পবিত্র ও
অভ্রান্ত শরী‘আতকে প্রত্যাখ্যান
করে নিজেদের রচিত আমল সমূহকে
প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইজমার
দাবী তোলা হচ্ছে যত্রতত্র। বিশেষ
করে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নামে অনেক
বিষয়ে ইজমার দাবী তোলা
হয়েছে। যেমন
ঈদ ও জানাযার তাকবীরের
ব্যাপারে দাবী তোলা হয়েছে। তাই
বিশ্ববিখ্যাত মনীষী, লেখনী জগতের
এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক আল্লামা নবাব ছিদ্দীক্ব হাসান
খান ভূপালী (১২৪৮-১৩০৭ হিঃ/১৮৩২-১৮৯০ খৃঃ)
উক্ত নীতির প্রতিবাদ করে
বলেন,
مِنْ مَذَاهِبِ أَهْلِ الْعِلْمِ يَظُنُّ
أَنَّ مَا اتَّفَقَ عَلَيْهِ
أَهْلُ مَذْهَبٍ أَوْ أَهْلُ قُطْرِهِ
هُوَ إِجْمَاعٌ وَهَذِهِ مُفْسِدَةٌ عَظِيْمَةٌ
‘মাযহাবপন্থী আলেমগণের ধারণা হল, মাযহাবের
অনুসারীগণ অথবা কোন নির্দিষ্ট
অঞ্চলের অধিবাসীরা কোন বিষয়ে একমত
পোষণ করলেই তা ইজমা
হয়ে যাবে। অথচ
এটা এক মহাবিপদাত্মক বিভ্রান্তি’।[৮]
(ঘ) সবচেয়ে বড়
বিষয় হল, ছাহাবীদের পর
ইজমার দাবী তোলার অধিকার
কারো নেই। কারণ
তাঁদের পর ইজমার দরজা
বন্ধ হয়ে গেছে।
আর ইজতিহাদের দরজা ক্বিয়ামত পর্যন্ত
খোলা আছে। তাই
ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
مَنِ ادَّعَى الْإِجْمَاعَ فَهُوَ
كَاذِبٌ ‘যে ব্যক্তি ইজমার
দাবী করে, সে মিথ্যাবাদী’।[৯]
অতএব ইজমার দাবী যেই
করুক তা মিথ্যা ও
বাতিল বলে গণ্য হবে।
বিস্তারিত আলোচনা দ্রঃ ‘তারাবীহর
রাক‘আত সংখ্যা : একটি
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক বই।
(লেখক : ড. মুযাফফর বিন
মুহসিন)
◈◈◈◈
◈◈◈◈
তথ্যসূত্র : ![]()
[১]. আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ
ইবনু আহমাদ ইবনু কুদামা,
আল-মুগনী ওয়া আশ-শারহুল কাবীর (বৈরুত
: দারুল ফিকর, ১৯৯২/১৪১২),
১ম খণ্ড, পৃঃ ৮৫৩।
[২]. উমদাতুল ক্বারী, ৭ম খণ্ড, পৃঃ
২০৪।
[৩]. أَجْمَعَ الصَّحَابَةُ أَنَّ التَّرَاوِيْحَ عِشْرِيْنَ
رَكْعَةً - মোল্লা আলী ক্বারী,
মিরক্বাতুল মাফাতীহ শরহে মিশকাতুল মাছাবীহ
(ঢাকা : রশীদিয়াহ লাইব্রেরী, তাবি), ৩য় খণ্ড,
পৃঃ ১৯৪, ‘রামাযান মাসে
রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ।
[৪]. উমদাতুল ক্বারী ৭ম খণ্ড,
পৃঃ ২০৪-৫; তুহফাতুল
আহওয়াযী ৩য় খণ্ড, পৃঃ
৪৩৯।
[৫]. ড. মুহাম্মাদ কামেল
হুসাইন, ইমাম মালেক ও
মুওয়াত্ত্বা কিতাব, দ্রঃ মুওয়াত্ত্বা
মালেক (বৈরুত : দারুল কুতুব আল-ইলমিয়াহ, তাবি), ভূমিকা।
[৬]. ছালাতুত তারাবীহ, পৃঃ ৭২।
[৭]. তুহফাতুল আহওয়াযী, ৩য় খণ্ড, পৃ:
৪৪৭।
[৮]. ছিদ্দীক্ব হাসান খান ভূপালী,
আস-সিরাজুল ওয়াহহাজ মিন কাশফে মাতালিব
ছহীহ মুসলিম বিন হাজ্জাহ
১/৩ পৃঃ; ছালাতুত
তারাবীহ, পৃঃ ৭২-৭৩।
[৯]. ই‘লামুল মুওয়াক্কেঈন
২য় খণ্ড, পৃঃ ১৭৫। ![]()
২০ রাক‘আত তারাবীহর উপর ইজমা হওয়ার দাবী কি সঠিক? ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
0
এপ্রিল ০২, ২০২২
Tags

